পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের অবহেলায় হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেল ২১ গ্রামের কৃষকের স্বপ্ন
ছাতক প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার চরমহল্লা হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে অন্তত ২১ গ্রামের কৃষকের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম আর স্বপ্ন। পাহাড়ি ঢল, টানা ভারী বর্ষণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর অবহেলা—এই তিনের সম্মিলিত আঘাতে মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যায় কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধানের বিশাল এলাকা। এতে কয়েক হাজার কৃষক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো উদ্যোগ নিলে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামান্য সচেতনতা তাদের সর্বনাশ ঠেকাতে পারতো।
অতিরিক্ত বরাদ্দ, অনিয়ম ও অযোগ্য পিআইসির বৈরী চক্র
চলতি বোরো মৌসুমে ছাতক উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতার অভিযোগ প্রথম থেকেই ওঠে। এলাকাবাসীর দাবি—অধিকাংশ পিআইসিকে যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই পূর্বের কমিটিকে বহাল রাখা হয়। এতে দক্ষতার চেয়ে পরিচিতি, দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কই বেশি প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরমহল্লা হাওরের বাড়ুকা বিল, বাগেছড়া বিল, গোজাগাট্টি বিল ও বুড়াইর গিরি বিলকে প্রকল্পের আওতায়ই রাখা হয়নি। কৃষকদের অভিযোগ—এই এলাকাগুলো বছরের পর বছর বরাদ্দ বঞ্চিত থেকে আসছে, অথচ বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা এই অংশটিই।
বহুবার আবেদন—কিন্তু প্রশাসনের অনড় নীরবতা
স্থানীয় কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব বিলকে পিআইসির আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছেন। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরে ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছেও অনুরোধ জানান। এ বছরও পুনরায় আবেদন করা হলেও তা কার্যকর পদক্ষেপে পরিণত হয়নি।
কৃষকদের অভিযোগ—তৎকালীন ইউএনও তারিকুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত প্রভাব অনুযায়ী পরিচিতদের পিআইসি বরাদ্দ দেন। এতে কৃষকদের আবেদনের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয় এবং হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ প্রকল্পের বাইরে থেকে যায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি সহায়তা না পেয়ে স্থানীয় মানুষজন নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণে বাধ্য হন।
স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধ—তবু রক্ষা হলো না ধানের ক্ষেত
সরকারি বরাদ্দ বা কারিগরি সহায়তা না পেয়ে কৃষকরা নিজেরাই অর্থ ব্যয় করে ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত কারিগরি তদারকি না থাকায় সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষকদের ভাষ্য—বুঝতেই না পারার আগেই প্রবল স্রোতে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় তাদের বোরো ধান।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
“আমরা মাসের পর মাস আবেদন করেছি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নিতো, আজ আমরা পথে বসতাম না। পানি উন্নয়ন বোর্ড আর প্রশাসনের অবহেলাই আমাদের সর্বনাশ করেছে।”
কৃষকদের ধারণা—এবারের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার বেশি হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যাখ্যা—দায় এড়ানোর চেষ্টা?
ছাতক উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দুজ্জামান নাহিদ বলেন—
“যেসব হাওর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় নেই, সেখানে পিআইসির মাধ্যমে কাজ করা হয় না। এসব হাওরে ভাঙা বাঁধ কৃষকরাই মেরামত করেন। তবে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এসব হাওরকে বিবেচনায় আনা হবে।”
কৃষকদের দাবি—এই বক্তব্য আসলে দায় এড়ানোর কৌশল। কারণ হাওরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোকেই বছরের পর বছর ধরে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়নি। বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পরিবর্তে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
হাওর রক্ষা আন্দোলনের পর্যবেক্ষণ—অনিয়মই ভাঙনের মূল কারণ
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন, ছাতক উপজেলা শাখার আহ্বায়ক দিলোয়ার হোসেন ও সদস্য সচিব উজ্জীবক সুজন তালুকদার বলেন—
“শুরু থেকেই অনেক পিআইসিতে অপরিকল্পিতভাবে কাজ করা হয়েছে। কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ, আবার কোথাও কাজের প্রকাশ্য অনিয়ম—সবকিছুই আমরা পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি। চরমহল্লার বাগেছড়া হাওরকে পিআইসির আওতায় আনা হলে কৃষকরা এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না।”
তাদের মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন দুপক্ষেরই অবহেলা এ বিপর্যয়ের জন্য সমানভাবে দায়ী।
ইউপি সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষোভ
স্থানীয় ইউপি সদস্য নাছির উদ্দিন বলেন—
“কৃষকরা বারবার আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। পরে নিজেরা বাঁধ বানালেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না।”
ছাতক পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন—
“হাওরটি যদি পিআইসির আওতায় থাকতো, তাহলে এমন ক্ষতি হতো না। অন্তত ১৫টিরও বেশি গ্রামের কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
অবশেষে কৃষি বিভাগের স্বীকারোক্তি
ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান জানান—
“বাগেছড়া হাওরের ৩৭ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের কাছ থেকেই আমরা তথ্য পেয়েছি। অন্য হাওরে ভাঙনের খবর এখনও পাইনি।”
তিনি বলেন, ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
ইউএনওর বক্তব্য—“সময়মতো আবেদন পাইনি”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডিপ্লোম্যাসি চাকমা বলেন—
“কৃষকরা ২০২৫ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে আবেদন করেছিলেন বলে জেনেছি। যেহেতু পূর্বে হাওরটি পিআইসির আওতায় ছিল না, তাই চলতি মৌসুমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। ভবিষ্যতে হাওরটি পিআইসির আওতায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি—তদন্ত, ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণ
হাওরের ২১ গ্রামের কৃষকরা জোর দাবি জানিয়েছেন—
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত
অনিয়মে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ
চরমহল্লা হাওরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, হাওর রক্ষায় পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও কৃষকদের এমন দুর্ভোগ থামবে না।
তাদের ভাষায়—
“ফসল বাঁচাতে বাঁধ চাই, বাঁধ বাঁচাতে সুশাসন চাই।”
Leave a Reply