দালালমুক্ত সেবা ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগে জিরো টলারেন্স ঘোষণা এমপি আবুল হাসানের
ধনী-গরিব সমান অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান; জকিগঞ্জকে মাদক রুটের অপবাদমুক্ত করার নির্দেশ”
আহসান হাবীব লায়েক, জকিগঞ্জ : সততা, জবাবদিহিতা ও জনসেবাকে প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট-৫ (কানাইঘাট–জকিগঞ্জ) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণের সুযোগ আর থাকবে না। “এমপি সাহেবের লোক” পরিচয়ে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ প্রয়োগের সংস্কৃতি বন্ধ করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করেন।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় উপস্থিত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এমপি বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে, আর নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হলে তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-এখানে রাজনৈতিক মত বা দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই। “রাজনীতি করা অপরাধ নয়; কিন্তু হয়রানি অপরাধ”-এই নীতিতে তিনি অনড় থাকার ঘোষণা দেন এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করার কথা জানান। তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে মামলা, গ্রেপ্তার বা প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে দেখা হবে।
সরকারি দপ্তরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে এমপি বলেন, সাধারণ মানুষ যেন দালাল বা তদবির ছাড়া সরাসরি সরকারি সেবা পায় সেটিই প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার দিতে হবে। কোনো অফিসে দালালের উপস্থিতি সহ্য করা হবে না এবং দালালচক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, জনগণের দৌড়ঝাঁপ ও ভোগান্তি কমানোই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জকিগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে ‘মাদকের রুট’ হিসেবে পরিচিত-এই অপবাদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে মুছে ফেলতে হবে। পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর কোনো ‘পাতি নেতা’ নেই-আইনের চোখে সবাই সমান এবং অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই।
উন্নয়ন প্রসঙ্গে এমপি মুফতি আবুল হাসান বলেন, কানাইঘাট–জকিগঞ্জ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া হবে। উন্নয়ন যেন মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করে-সেই লক্ষ্যেই কাজ করা হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে তাদের সমস্যা, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত ঘাটতির তালিকা প্রস্তুত করে তাঁর কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
কৃষি খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জকিগঞ্জের সব কৃষিজমি চাষাবাদের আওতায় আনতে হবে এবং একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। কৃষি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এ বিষয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নদীভাঙন প্রসঙ্গে এমপি বলেন, এটি শুধু জকিগঞ্জের মানুষের সমস্যা নয়-দেশের মানচিত্র রক্ষার প্রশ্ন। নদীভাঙনে প্রতি বছর মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও অবকাঠামো বিলীন হচ্ছে। তাই বর্ষা মৌসুমের আগেই প্রতিরোধমূলক সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত প্রতিবেদন তাঁকে দিতে হবে। তিনি বলেন, নদীভাঙন রোধে সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে ক্ষতি আরও বাড়বে।
রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকতে পারে। ভোক্তা অধিকার ও প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শেখ মো. আব্দুল আহাদ, জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন, জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুকসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম, সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় তুলে ধরেন।
সভাটি জুড়ে জনসেবার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে জকিগঞ্জে সুশাসন ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপস্থিত কর্মকর্তারা।
Leave a Reply