ছাতকে সিমেন্ট কোম্পানির দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে — শিল্প উপদেষ্টা
স্টাফ রিপোর্টার,ছাতক
সুনামগঞ্জের ছাতক যেন আবার জাগছে—ধুলোপ্রান্তরে থমকে থাকা মিলের চাকা যেন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুর তুলছে। দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে থাকা ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নতুন প্রাণ সঞ্চারের আশ্বাস দিলেন শিল্প ও স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। শুক্রবার বেলা ১২টার সূর্যালোকে যখন উপদেষ্টা মিল প্রাঙ্গণে পা রাখেন, ঠিক তখনই যেন বহুদিনের স্থবিরতা ভেঙে উঠে আসে এক নতুন প্রত্যয়ের ঢেউ।
উপদেষ্টা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন,“ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির বিদ্যমান ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তর কার্যক্রম দ্রুতই সম্পন্ন হবে। আধুনিকায়ন শেষ হলেই উৎপাদন কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু হবে।” তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, কথায় ছিল সরকারের শিল্পায়নবিষয়ক ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত। তিনি আরও বলেন—জুলাই অভ্যুত্থান দেশের শিল্পমুখী দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করেছে। আগামীর নির্বাচিত সরকার সেই পথ অনুসরণ করেই নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিল্পবিপ্লবের রাস্তা প্রসারিত করবে। শিল্পের অগ্রযাত্রা–গণতন্ত্রের পথচলা—উপদেষ্টার স্পষ্ট বার্তা উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন,আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ এখন সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোট। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আমরা চাই শিল্পের চাকা ঘুরুক, মানুষের ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের আলো পৌঁছাক।”তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার।পরিদর্শনকালে মিলের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখেন উপদেষ্টা। আধুনিকায়নের সম্ভাবনা, যন্ত্রপাতি রূপান্তরের পরিকল্পনা, উৎপাদন ঘণ্টা বৃদ্ধির প্রস্তাবসহ কর্মীদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা বলেন তিনি। কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে উপদেষ্টা জানান—ড্রাই প্রসেস প্রযুক্তি চালু হলে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি শুধু পূর্বের অবস্থানেই ফিরবে না, বরং দেশের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদনকারী হয়ে উঠবে।বিসিআইসির চেয়ারম্যানের দৃঢ় আশ্বাস: ‘খুব দ্রুতই উৎপাদন শুরু হবে’পরিদর্শন শেষে বিসিআইসি-এর চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন,উৎপাদন পুনরায় চালুর জন্য যেসব টেকনিক্যাল প্রস্তুতি দরকার, সেগুলো দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আমরা চাই এই মিল আবার তার পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনুক।” তিনি আরও জানান, ড্রাই প্রসেস প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর উৎপাদন ব্যয় কমবে, দক্ষতা বাড়বে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা সীমিত উৎপাদনে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিমেন্ট মিলটি পুনরায় সচল হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমনটাই জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা। উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি—পরিদর্শন ঘিরে আলাদা গুরুত্ব উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সরকারি উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা—স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান
ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রহমান এ ছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন। এত উঁচু পর্যায়ের উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়—ছাতক সিমেন্ট মিল পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার কতটা গভীর। প্রকল্প পরিদর্শনে ব্যস্ত দিন শুরু উপদেষ্টার।দিনের শুরুতেই উপদেষ্টা পরিদর্শন করেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প—
“ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ‘ছাতক–কাটাখালী ভায়া দোয়ারাবাজার’ সড়ক উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন করেন তিনি।
সড়কটি ছাতকের যোগাযোগব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আম্পান ও পরবর্তী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি পুনর্নির্মাণ হলে স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ, জরুরি পরিবহন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনায় উপদেষ্টা প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। ছাতকের মানুষ চায় আগের প্রাণ—নতুনভাবে ফিরে পাওয়ার আশা ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি শুধু একটি শিল্পকারখানা নয়—এটি ছাতকের ইতিহাস, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবারগুলোর ভরসা। বহু শ্রমিকের ঘরে আহারের আলো এসেছে এ মিলের উৎপাদন থেকে। তাই মিলের নতুনভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা স্থানীয় মানুষকে নতুন আশায় ভরিয়ে তুলেছে।মিল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এক শ্রমিক বলেন,
“স্যাররা আসছেন, মিল ঘুরতেছে—মনে হয় আবার কাজ পাইবো। তার কণ্ঠে চোখের পানির মতো ভেসে ওঠে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি ও নতুন দিনের স্বপ্ন। উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় খুলতে যাচ্ছে ছাতক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের বক্তব্যে স্পষ্ট—আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে শিল্পায়নই হবে মূল চালিকাশক্তি। ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির আধুনিকায়ন সে স্বপ্নের একটি অংশ। বিশ্লেষকদের মতে,ড্রাই প্রসেসে উৎপাদন হলে পরিবেশ দূষণ কমবে কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে শ্রমিকদের দক্ষতা ব্যবহার বাড়বে দেশের নির্মাণ শিল্পে স্থানীয় সিমেন্টের যোগান শক্তিশালী হবে এদিকে এলজিইডির সড়ক উন্নয়ন কাজও সুনামগঞ্জের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। শিল্প উপদেষ্টার সফর—ছাতকে নতুন আলো শুক্রবারের এই সফর যেন ছাতকের অর্থনীতিতে নতুন বাতাস বইয়ে দিল। উপদেষ্টার বক্তব্য, সচিবদের উপস্থিতি, বিসিআইসির আশ্বাস—সব মিলিয়ে মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—“ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির চাকা আবার কবে ঘুরবে?”
সরকারি কর্মকর্তারা বলেন—দ্রুতই।যে শব্দটি বারবার উচ্চারিত হলো—“দ্রুতই শুরু হবে উৎপাদন।”সুনামগঞ্জের ছাতক আজ একটি নতুন আশা নিয়ে জেগে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির আধুনিকায়ন শুধু একটি শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের ঘটনা নয়—এটি ছাতকের মানুষের স্বপ্ন, কর্মসংস্থানের পুনর্জন্ম, এবং দেশের শিল্পোন্নয়নের এক অগ্রযাত্রা। সেদিনের পরিদর্শন যেন ঘোষণা দিল—ছাতক আবার ফিরবে তার পুরনো মর্যাদায়, মিলের চাকা আবার ঘুরবে, আর নতুন দিনের কর্মসংস্থানের আলো ছড়িয়ে পড়বে পাহাড়, নদী আর খাসিয়ার দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা ছাতকের আকাশে।
Leave a Reply