অবশেষে বদলি—অভিযোগের পাহাড়ে চাপে
সুনামগঞ্জের বিতর্কিত ডিসি ইলিয়াস মিয়া
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, অনিয়ম, অযাচিত ক্ষমতার অপব্যবহার ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিস্ফোরিত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অবশেষে বদলি হলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। জেলার মানুষের ভাষায়—“এটি সুনামগঞ্জবাসীর বহু বছরের দুঃস্বপ্নের অবসান।”
জেলায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগে ঘিরে ছিলেন তিনি। মব–সন্ত্রাসীদের আশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় পিআইসি অনুমোদনের নামে কোটি কোটি টাকার অপচয়, সাংবাদিক হয়রানি, খনিজ সম্পদ লুট, আদালতের আদেশ অমান্য, সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ না করে উল্টো হয়রানি—সব মিলিয়ে তার চারপাশে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য অত্যাচারী বৃত্ত।
বদলির খবরে সুনামগঞ্জ জেলায় স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
২৫০টি অযাচিত পিআইসি—কোটি টাকার ‘বাণিজ্য’
হাওর অঞ্চলের প্রাণ—ফসল রক্ষা বাঁধ। আর সেই বাঁধ নির্মাণে পিআইসি অনুমোদন নিয়ে যে নীরব বাণিজ্য চলছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ওই ডিসি—এমন অভিযোগ বহুবার বিভিন্ন মহলের।জেলার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রায় ২৫০টি পিআইসি অনুমোদন দিয়ে সরকারি তহবিলের টাকা ‘বিনিয়োগ’ হয়েছে একটি গুটিকয়েক পরিবারের হাতে। স্থানীয়রা বলেন, “এটি ছিল বাপ–পুতের, চাচা–ভাতিজার একচ্ছত্র পিআইসি সাম্রাজ্য।”
মনিটরিং কমিটিতে নিজের পছন্দমতো সদস্য বসানো, স্বজনপ্রীতিতে প্রকল্প বণ্টন এবং পিআইসির নামে পোষ্য সাংবাদিক তৈরির অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। হাওরাঞ্চলে সময়মতো কাজ না হওয়ায় প্রচুর জমির ধান ডুবে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরাসরি জেলা প্রশাসককে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলনও করেন।
মজলুম মানুষকে অপমান—জুলাইযোদ্ধা জহুর আলীও বাদ যাননি জেলার প্রবীণ জুলাইযোদ্ধা জহুর আলীর সঙ্গে অসদাচরণ ও অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় সামাজিকভাবে। অভিযোগ রয়েছে—সাধারণ মানুষ বিচার চেয়ে গেলে ন্যায্যতা না দিয়ে উল্টো হয়রানি করা হতো।
মানুষের ভাষায়, “এই অফিস ছিল নালিশকারীর নয়, নির্যাতনের ঘর।”
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হস্তক্ষেপ—বাউল ঐতিহ্য অবমাননার অভিযোগ সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে লোকসংগীত। জেলার প্রধান পাঁচ লোককবির মধ্যে বাউল শিল্পী শাহ আব্দুল করিম ও দূর্বিণ শাহ–এর তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে—এই জেলা প্রশাসক বাউল সংগীতের ধারাকে অবমূল্যায়ন করেন,বাউল সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করতে নানা বাধা দেন। জেলার শিল্পীরা বলেন—“বাউল কর্মকাণ্ডকে দমিয়ে নাট্যগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় নিজের পছন্দমতো সাংস্কৃতিক বলয় সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।”
হাইকোর্ট অবমাননা থেকে নির্বাচন—সবখানেই ‘বিতর্কের ছায়া’
মহামান্য হাইকোর্টে আদালত অবমাননার মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে তার নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
নির্বাচনকালেও অভিযোগের অন্ত ছিল না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ৮৫ জন সাংবাদিককে পাসকার্ড না দেওয়ার ঘটনা প্রশস্ত সমালোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিক সমাজের অভিযোগ—নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্যপ্রবাহ বাধা দেওয়া হয়েছিল।
গরু আটক ও তদন্ত জবানবন্দি ঘিরে সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ ৩০ এপ্রিল বিজিবি আটক করে ভারতীয় ৯০টি গরু। সিলেট কাস্টমসের তদন্ত কমিটির সামনে কয়েকজন সাংবাদিক ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেন, যেখানে কথিত সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের সঙ্গে কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে।
এর পরই অভিযোগ—আক্রোশে সাংবাদিক আল হেলাল ও আফতাব উদ্দিনের জুলাইযোদ্ধা গেজেট বাতিল করে বিতর্কিত প্রতিবেদন পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে, যা ছিল সুস্পষ্ট প্রতিশোধমূলক আচরণ।
শ্রীপুর দেবোত্তর এস্টেট মামলা: আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ তাহিরপুরে ‘খাস কালেকশন’-এর নামে লাখো টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে, যেখানে আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সুবিধাভোগী মহলের প্রভাব বিস্তার হয়েছে বলে অভিযোগ বিভিন্ন ভুক্তভোগীর।
নারীকে অশালীন ভাষা, সাংবাদিককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য—আচরণে ক্ষোভ তুঙ্গে জেলার প্রথম মতবিনিময় সভায় এক সাংবাদিক খাল খননের গুরুত্ব তুলে ধরলে তাকে প্রকাশ্যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অভিযোগে সাংবাদিক সমাজ ক্ষুব্ধ হয়। নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও আসে প্রশাসনিক ভবনের ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে।
খনিজ লুট ও সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট—‘প্রশাসনের ছায়ায়’ অভিযোগ মাটি, বালি, পাথর—জেলার খনিজসম্পদ লুটে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বছরের পর বছর সক্রিয় ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি—এই সিন্ডিকেট প্রশাসনিক ছত্রছায়া ছাড়া এতটা বলয় বিস্তার সম্ভব ছিল না। মবসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিলে উল্টো অভিযোগকারীরাই নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
বদলি—স্বস্তির নিশ্বাস, সুনামগঞ্জবাসীর কৃতজ্ঞতা এসব অভিযোগের ভারে ন্যুব্জ প্রশাসনিক পরিবেশে অবশেষে বদলির সিদ্ধান্ত আসে। এই সিদ্ধান্তকে অনেকে “বহুদিনের ক্ষোভের অবসান” হিসেবে দেখছেন।
সুনামগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–কে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে “গণদাবির ফল বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনকে স্বচ্ছতার পথে ফিরিয়ে আনার” জন্য। সুনামগঞ্জ এখন নতুন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে—যেন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ভয়ভীতি–নিয়ন্ত্রিত অধ্যায়ের অবসান ঘটে, সাধারণ মানুষ ফিরে পায় ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের আশ্বাস।
Leave a Reply