কুলি থেকে শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য!হাজী স্বপনকে গনধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোর্পদ করেছে !
ছাতকের স্বপন মিয়াকে ঘিরে টেন্ডারবাজি, বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এক যুগ আগেও কুলি-রিকশাচালক, এখন বাড়ি-জমি, ভবন, বাল্কহেড ও ঠিকাদারি ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য; সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত দাবি
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:বিত’র্কিত আওয়ামী লীগ বালু খেকো,সুরমা নদীর ড্রেজার ডন,চোরাচালানী সীমান্ত এলাকার নামধারি ডন,হুন্ডি ক্যাডার হাজী স্বপনকে জনতা আটক করে উত্তম মধ্যম দিয়ে পুলি’শের হাতে তোলে দেয়ার এঘটনায় জেলাজুড়েই ব্যাপক সমােলোচনার ঝড় বইছে। জনতার হাতে আটক হলেন বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন।১৩ সেপ্টেম্বার রাত ১১ টার দিকে ছাতকপৌর শহরের তাহির প্লাজার সামন থেকে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটক করে,মারপিট করে থানায় হাতে সোপর্দ করে।
একসময় জীবিকার তাগিদে কুলির কাজ করেছেন। কখনো রিকশা চালিয়েছেন, কখনো হোটেলে কাজ করেছেন, আবার কখনো চাল বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। রাজমিস্ত্রির কাজও করেছেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই স্বপন মিয়াই এখন বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক। ছাতক পৌর শহর দোয়ারাবাজারজুড়ে তার সম্পদ, ব্যবসা, ঠিকাদারি কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
স্থানীয়ভাবে ‘কাইল্লা স্বপন’ নামে পরিচিত এই স্বপন মিয়াকে ঘিরে উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের একাংশের দাবি—রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা, সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, বালু-পাথর উত্তোলন, নৌপথে চাঁদাবাজি, সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো হয়নি।অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং তার সম্পদের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে।
কুলি থেকে ঠিকাদারি ব্যবসার ‘বড় খেলোয়াড়’সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চল থেকে ছাতক শহরে আসেন স্বপন মিয়া। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তার কর্মজীবনের শুরু ছিল শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে। কুলি, রিকশাচালক, হোটেলকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন তিনি।
এরপর ধীরে ধীরে ঠিকাদারি ও ব্যবসায় প্রবেশ করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তার ভাগ্যের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর স্বপন মিয়ার প্রভাব ও ব্যবসায়িক পরিধি বাড়তে থাকে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। একসময় যিনি দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তার অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠাকে ‘অস্বাভাবিক উত্থান’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে ওঠে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ বাগিয়ে নিতে স্বপন মিয়ার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
দোয়ারাবাজারে নদীভাঙন রক্ষা প্রকল্পের চারটি কাজ এখনো তার প্রতিষ্ঠানের নামে চলমান রয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—একই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের হাতে কীভাবে বিপুল সরকারি কাজের নিয়ন্ত্রণ এসেছে এবং এসব কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া কতটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল?
স্থানীয়দের দাবি, শুধু পুরোনো প্রকল্প নয়, সাম্প্রতিক সময়েও সরকারি বিভিন্ন কাজের টেন্ডারকে ঘিরে তার প্রভাব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, বালু, পাথর, ভাঙারি মালামাল সরবরাহ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার কথা বলে একাধিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুত মালামাল বা সুবিধা না দিয়ে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নানা টালবাহানা।
কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এমনকি হামলা, মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। ব্যবসায়ী আবু হুরায়রা সুরত, আশরাফুল আলম, সালেক কমিশনার, হিজবুলবারি শিমুল, সুমেন আহমেদ ও কয়েছ আহমদসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, এসব বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ব্যবসায়ীদের অর্থ ফেরত এবং অভিযোগের তদন্ত না হলে ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বালু-পাথর ও নৌপথ নিয়েও প্রশ্ন
ছাতক-দোয়ারাবাজারের নদ-নদী ও বালুমহালকে ঘিরেও স্বপন মিয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন এবং নৌপথে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।
নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ও নদীর তীরবর্তী মানুষের বসতভিটা হুমকিতে পড়ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেই প্রেক্ষাপটে বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর পেছনে অর্থ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সীমান্তবর্তী এলাকাতেও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণ যাচাই প্রয়োজন।
শহরে বাড়ি, ভবন, জমি ও বাল্কহেড
স্বপন মিয়ার সম্পদের তালিকা নিয়েও এলাকায় চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয়দের দাবি, ছাতক শহরের মন্ডলীভোগ এলাকায় তার দুটি বাড়ি রয়েছে। রহমতবাগ এলাকায় রয়েছে আরও দুটি বাড়ি। ছুরাবনগর ও লেবারপাড়া এলাকাতেও সম্পদ থাকার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কোর্ট রোড এলাকায় প্রায় ৯০ শতক জমি, ছাতক শহরে একাধিক বহুতল ভবন ও মার্কেট এবং নামে-বেনামে আরও জমিজমা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি বাল্কহেডসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সম্পদের কথাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে।
এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য কত, কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং এগুলোর বিপরীতে বৈধ আয় ও বিনিয়োগের হিসাব কত—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, তার আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ভবনের মালিকানা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি প্রকল্প থেকে পাওয়া অর্থের নথি যাচাই করা হলে সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনেও আলোচনায়
২০২১ সালের নরসিংপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বপন মিয়া চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পাওয়ার প্রত্যাশী ছিলেন। পরে নৌকা না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। তবে নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। নির্বাচনে পরাজয়ের পরও স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। ব্যবসা ও ঠিকাদারি অঙ্গনেও তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের পরও কি বদলায়নি চিত্র?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে রাজনীতি থেকে সরে গেলেও স্বপন মিয়ার ব্যবসায়িক প্রভাব ও কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্ডলীভোগ এলাকায় তার বাসাকে কেন্দ্র করে এখনো বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও ঠিকাদারি বিষয়ে বৈঠক হয়। সন্ধ্যার পর গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন লোকজনের আনাগোনা দেখা যায় বলেও দাবি তাদের। তবে এসব বৈঠকে বেআইনি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়—এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘
সম্পদের পাহাড়’—উৎস কোথায়?
সব অভিযোগের কেন্দ্রে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—কুলি থেকে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার এই উত্থানের অর্থের উৎস কী? স্বপন মিয়া যদি বৈধ ব্যবসা, ঠিকাদারি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে থাকেন, তাহলে তার নথিপত্রেই এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকার কথা। আর যদি রাজনৈতিক প্রভাব, অবৈধ বালু উত্তোলন, সরকারি টেন্ডারে অনিয়ম কিংবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ অর্জনের অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। অভিযোগ সত্য হলে আইনি ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অপপ্রচারের অবসান—দুই ক্ষেত্রেই তদন্ত জরুরি। স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—স্বপন মিয়া কি কেবল একজন সফল স্বনির্ভর ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য? উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, দুদক, আয়কর বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকৌশল দপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে তার সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক লেনদেন তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। ছাতকের মানুষের এখন অপেক্ষা—অভিযোগের পাহাড়ের নিচে আসলেই কী লুকিয়ে আছে, আর কুলি থেকে শতকোটি টাকার এই বিতর্কিত উত্থানের রহস্যই বা কতটা সত্য।
Leave a Reply