কয়ছর–তালহা বাধাহীন, জমে উঠছে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের ভোটের লড়াই
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রবাসী অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর–শান্তিগঞ্জ) সংসদীয় আসনে এবার ত্রিমুখী নয়, বরং বহুমুখী লড়াই জমে উঠছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের বিরুদ্ধে আনা দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে এবি পার্টির প্রভাবশালী প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমের মনোনয়নও বহাল রেখেছে ইসি। ফলে দুই জনপ্রিয় প্রার্থীর ভোটে লড়তে আর কোনো বাধা রইল না।
এ আসনটি মূলত দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী নির্ভর রাজনীতির এলাকায় পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, আমেরিকা ও ইউরোপ প্রবাসীদের ভোট, অর্থনৈতিক সংযোগ ও নির্বাচনী প্রভাব-—সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ সব সময়ই আলোচনায় থাকে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ খারিজ—স্বস্তিতে বিএনপির কয়ছর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে আপিল করেন একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। একই অভিযোগে আপিল করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাড. ইয়াসীন খান।
৮ জানুয়ারি ব্যারিস্টার আনোয়ারের দায়েরকৃত আপিল মোকদ্দমা নম্বর–৪৩১, এবং ইয়াসীন খানের আপিল ৫৪১ হিসেবে গ্রহণ করে কমিশন। বিপরীতে কয়ছর আহমেদও আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের পাল্টা অভিযোগ এনে আপিল ৫৮০ দায়ের করেন। একই অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমেদের আপিল ৪৯৮-ও ইসিতে জমা পড়ে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার শুনানিতে মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ নিজে উপস্থিত হয়ে ব্রিটিশ নাগরিক নন—এর প্রমাণস্বরূপ যাবতীয় কাগজপত্র কমিশনের সামনে উপস্থাপন করেন। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর পূর্ণাঙ্গ কমিশন আনোয়ার হোসেনের আপিল খারিজ ঘোষণা করে।।রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় কয়ছর আহমেদ বলেন,এ অভিযোগ ছিল উদ্দেশ্যমূলক। নির্বাচনী মাঠ থেকে আমাকে সরাতে চেয়েছিল নির্দিষ্ট একটি মহল। কমিশনে ন্যায্যতা পেয়েছি—এটাই আমার বড় স্বস্তি।”আয়কর জটিলতা মিটে গেল তালহার—এবি পার্টি পেল বড় স্বস্তি এ আসনের আরেক শক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বী সৈয়দ তালহা আলম, যিনি এবি পার্টির প্রার্থী। ৩ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসে মনোনয়ন যাচাই–বাছাইকালে আয়কর কর্তৃপক্ষ তালহার কাছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বকেয়া দাবি করলে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
তালহা আলম জানান,“আমার বিদেশি রেমিটেন্স থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ট্যাক্স দাবি করা হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি ছিল আইনসঙ্গত নয়।”অবশেষে তাঁর আপিলের শুনানিতে নির্বাচন কমিশন কর সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে তালহার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে। ফলে এবি পার্টির হয়ে আওয়ামী লীগ–বিরোধী ভোটব্যাঙ্ককেও প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
আপিল শুনানির অগ্রগতি: ছয় দিনে মঞ্জুর ২৭৭টি
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ৩৮১ থেকে ৪৮০ নম্বর পর্যন্ত আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ কমিশন সকাল ১০টা থেকে শুনানি শুরু করে, দুপুরে এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রক্রিয়া চালায়।
ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসাংবাদিকদের জানান—গত পাঁচ দিনে মোট ৩৮০টি আপিলের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে—মঞ্জুর হয়েছে ২৭৭টি,বাতিল হয়েছে ৮১টি,
অপেক্ষমাণ রয়েছে ২৩টি।আগামী ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) জুমার পর বিকেল ৩টা–৫টা পর্যন্ত ৪৮১ থেকে ৫১০ নম্বর পর্যন্ত শুনানি হবে। ১৭ জানুয়ারি (শনিবার) ৫১১–৬১০ নম্বর
এবং ১৮ জানুয়ারি (রোববার) ৬১১–৬৪৫ নম্বরসহ অপেক্ষমাণ সকল আপিল নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়া শেষ হবে।
জগন্নাথপুর–শান্তিগঞ্জে নির্বাচনী উত্তাপ বাড়ছে এখনই প্রচারের মাঠে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক তৎপরতা। জেলা ও দুই উপজেলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—“কয়ছর ও তালহা উভয়ের মনোনয়ন বহাল থাকা এ আসনের ভোটকে আরও জমজমাট করবে।”এই আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় আছেন—
১১ দলের শরিক খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি অ্যাড. মাওলানা শাহীনুর পাশা,
জামায়াতের অ্যাড. ইয়াসীন খান,বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাফিজ মুশতাক আহমদ,এ ছাড়া আরও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন যারা প্রবাসী ভোটে বিশেষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
জগন্নাথপুরের একজন জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী যুগান্তরকে বলেন—
“কয়ছর আহমেদ ও তালহা আলম দুজনেই হেভিওয়েট। তাদের বিরুদ্ধে থাকা আইনি বাধা কেটে যাওয়ায় নির্বাচনী উৎসব এখনই তুঙ্গে।”ভোটের সময়সূচি নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী— ১৮ জানুয়ারি আপিল নিষ্পত্তির শেষ দিন,২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন, ২১ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ,এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
Leave a Reply