সাতটি আপিল মামলায় জটিলতা: সুনামগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে নজর এখন ইসিতে
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর–শান্তিগঞ্জ) আসন এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রীতিমতো আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জেলা সদর থেকে দূরে হলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব–সংঘাত এবংপ্রার্থীদেরশক্তঅবস্থানের কারণে এ আসনকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘ভিআইপি আসন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের নির্বাচনে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মনোনয়ন বাতিল, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ ও টানা আপিল মোকদ্দমার ধাক্কা—যা প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যাহত করে ভোটারদের মাঝেও সৃষ্টি করেছে নানা প্রশ্ন।
রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন, এরপর শুরু জটিলতা
মনোনয়ন দাখিলের সময় এ আসনে জেলার সর্বোচ্চ ৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। কিন্তু ৩ জানুয়ারি যাচাই-বাছাই শেষে চারজনের মনোনয়ন বাতিল হয় এবং পাঁচজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মোট সাতটি আপিল মোকদ্দমা দায়ের হওয়ায় সুনামগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থিতার হিসাব-নিকাশ এখন ঝুলে আছে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রার্থী-প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই,সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কয়ছর এম আহমেদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন—দুজনই ব্রিটেনপ্রবাসী এবং দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্র ধরেই একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কারা কার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন?
ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বিএনপি প্রার্থী কয়ছর এম আহমেদের বিরুদ্ধে আপিল মোকদ্দমা ৪৩১ দায়ের করেছেন (অভিযোগ: দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন)।।জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়াসীন খান একই অভিযোগে কয়ছর এম আহমেদের বিরুদ্ধে আপিল মোকদ্দমা ৫৪১ দায়ের করেন।
অপরদিকে কয়ছর এম আহমেদ পাল্টা অভিযোগ এনে ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আপিল ৫৮০ দায়ের করেছেন।
একই অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমেদ ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আপিল মোকদ্দমা ৪৯৮ করেছেন।
অর্থাৎ একজন আরেকজনকে অযোগ্য ঘোষণা করানোর এই লড়াই এখন নির্বাচনী এলাকাজুড়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে। মাঠে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যেও চলছে চাপা টানাপোড়েন।।মনোনয়ন ফিরে পেতে আরও তিনজনের আপিল
দ্বৈত নাগরিকত্বের লড়াই ছাড়াও মনোনয়ন বাতিল হওয়া তিনজন প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। এবি পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম – আপিল ৪৩৯।স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমেদ – আপিল ৪৭৮
স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ – আপিল ৫৬৬
বিশ্লেষকদের মতে, এত বেশি আপিল মোকদ্দমা অন্য কোনো আসনে দেখা যায়নি। এতে প্রার্থীদের মূল্যবান সময় আইনি লড়াইয়ে নষ্ট হচ্ছে—যার প্রভাব মাঠের প্রচারণায় পড়ছে।
নিরাপদে তিন প্রার্থী
সাতটি মামলার ঝড়ের মাঝেও তিনজন প্রার্থী সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছেন।।বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী।খেলাফত মজলিস প্রার্থী মুশতাক আহমেদ (যুক্তরাজ্যপ্রবাসী) জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়াসীন খান।তাদের প্রার্থিতা ঘিরে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ ওঠেনি। প্রার্থীদের বক্তব্য: সত্য ও তথ্যের লড়াই জামায়াত ইসলামী প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়াসীন খান বলেন,নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী হলফনামার প্রতিটি তথ্য হতে হবে সম্পূর্ণ সত্য। কেউ যদি ভুল বা গোপন তথ্য দেন, সেটা ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা। তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমি আপিল করেছি।” তার বক্তব্য ঘিরে জনমনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন—এবারের নির্বাচন শুধু প্রার্থীর জনপ্রিয়তা নয়, আইনি যোগ্যতা দিয়েও অনেক কিছু নির্ধারিত হবে।স্থানীয় জনমতের প্রতিক্রিয়া।জগন্নাথপুর নাগরিক অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক এম এ কাদির বলেন,
“সুনামগঞ্জ-৩ একটি ভিআইপি আসন। মানুষ বহুদিন পর ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। তাই তারা স্বচ্ছ ও যোগ্য প্রার্থী চায়। কিন্তু একে অপরের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ এবং সাতটি আপিল মোকদ্দমা আমাদের কাছে হতাশাজনক।”
তিনি আরও বলেন,“আমরা প্রত্যাশা করি—ভদ্রতা, সৌহার্দ্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগ-অভিযোগ ভোটারদের বিভ্রান্ত করে। অভিযোগ–বিপর্যয়ে মাঠের প্রচারণা থমকে এতগুলো মামলায় জড়িত থাকার কারণে প্রার্থীদের মাঠে প্রচারণা অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও এখন প্রার্থীরা সময় দিচ্ছেন আইনজীবীর অফিস ও ইসির করিডোরে।
স্থানীয়দের ভাষ্য—প্রার্থী ভোট চাইবে নাকি কাগজপত্র নিয়ে দৌড়াবে—এটাই এখন প্রশ্ন!সামনের গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো
১৮ জানুয়ারি: সব আপিল মোকদ্দমা নিষ্পত্তির শেষ দিন
২০ জানুয়ারি: প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়।২১ জানুয়ারি: প্রতীক বরাদ্দ ১২ ফেব্রুয়ারি: ভোটগ্রহণ অর্থাৎ আপিল মামলার রায় প্রকাশের পরই নির্ধারিত হবে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে কারা আসল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে টিকে থাকছেন।
সাতটি আপিল মামলা নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে এখন চরম অনিশ্চয়তা। আইনি লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে কারা প্রার্থী হিসেবে বৈধ থাকবেন, আর কারা ছিটকে পড়বেন নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে। অপরদিকে ভোটাররা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন—ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোন মুখগুলো নিয়ে তাদের সামনে আসবে নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রচারসামগ্রী।
রাজনৈতিক উত্তেজনা, অভিযোগ–প্রতিআরোপ এবং আইনি জটিলতার এই পরিবেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে তবেই শুরু হবে প্রকৃত নির্বাচনী লড়াই। আর সেই লড়াই কেমন হবে—তা নির্ভর করছে ১৮ জানুয়ারির রায়ের ওপর।
Leave a Reply