সুনামগঞ্জ–৫ আসনে নবীন–
প্রবীণ মুখোমুখি ত্রিমুখী লড়াই
ছাতক–সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও এবার বৈধ প্রার্থীদের তালিকায় দলটির কেউ না থাকায় লড়াই জমে উঠেছে নতুন বনাম অভিজ্ঞ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে। পরিচিত মুখদের পাশাপাশি নবীন প্রার্থীদের পদচারণায় নির্বাচনী মাঠ পুরোপুরি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
একটি পৌরসভা ও দুই উপজেলার মোট ২২ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ–৫ আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৪ জন। বৃহৎ এই জনসংখ্যার মন জয় করতেই সক্রিয় পাঁচ প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত—আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে: বিএনপি, জামায়াত ও খেলাফত মজলিস। মাঠে এগিয়ে অভিজ্ঞ প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন
নির্বাচনী বিশ্লেষণে সবচেয়ে এগিয়ে দেখা হচ্ছে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক এবং তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে।
দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, দোয়ারাবাজারে শক্ত নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব—এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই মিলন এবারও ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হয়ে উঠেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়—এই আসনে যিনি সংগঠন ধরে রাখতে পারেন এবং ঘরোয়া রাজনীতির বোঝাপড়া রাখেন, তিনিই সাধারণত এগিয়ে থাকেন। এই অলিখিত নিয়মেই মিলনকে এগিয়ে দেখছেন অধিকাংশ ভোটার।”
পাঁচ প্রার্থী মাঠে, কিন্তু লড়াই মূলত ত্রিমুখী রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত বৈধ প্রার্থী পাঁচজন বিএনপি: কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন জামায়াত: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তাহির মুহাম্মদ আবদুস সালাম আল মাদানী খেলাফত মজলিস: মাওলানা আব্দুল কাদির স্বতন্ত্র: দুইজন যদিও প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচ, স্থানীয় ভোটার ও বিশ্লেষকদের মতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—বিএনপি, জামায়াত ও খেলাফত মজলিস। ধর্মীয় ভোটব্যাংক ও দলীয় ভিত্তির ওপর জামায়াত ও খেলাফত মজলিস নির্ভরশীল হলেও মাঠের শক্তি, অভিজ্ঞতা ও জনসমর্থনের হিসেবে এখনো সবার সামনে মিলন। মিজান চৌধুরীর সরে দাঁড়ানো বদলে দিয়েছে পুরো সমীকরণ।বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী ও ছাতক উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তার উপস্থিতি মিলনের ভোটভাগে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারত—এমনটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধারণা করছিল স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
কিন্তু ৯ জানুয়ারি গুলশানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আবেগঘন বার্তায় মিজান লিখেছেন—“শ্রদ্ধেয় নেতা তারেক রহমান দলের স্বার্থে আমাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। নেতার অনুরোধ উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি।”
তার এই ঘোষণার পরপরই ছাতক দোয়ারাবাজারে ব্যাপক সাড়া পড়ে। বিএনপির সমর্থকরা নতুন উদ্যমে মাঠে নেমে পড়েন। ধানের শীষের পক্ষে গণজাগরণ তৈরি হতে সময় লাগেনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সাধারণ মত—মিজান চৌধুরীর সরে দাঁড়ানো মিলনের জয়ের সম্ভাবনা আরও দৃঢ় করেছে। মাঠে প্রবীণের প্রভাব, নবীনের ঢেউ এখনো দুর্বল এই আসনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, তবে তারা এখনও কোনো নবীন প্রার্থীকে স্পষ্টভাবে সমর্থন দেয়নি। পরিবর্তনের সুর থাকলেও তা সংগঠিত কোনো শক্তিতে রূপ নেয়নি।
অপরদিকে মিলনের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব, দোয়ারাবাজারে শক্ত অবস্থান এবং দলীয় নেটওয়ার্ক তাকে আরও এগিয়ে রেখেছে।জামায়াতের প্রার্থী আবু তাহির ধর্মীয় ভোট ও আদর্শিক সমর্থকদের ওপর ভরসা করলেও বিস্তৃত সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কাদিরও এলাকায় পরিচিত মুখ হলেও ভোটের বাস্তবতায় লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের সরব প্রস্তুতি জেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দিন–রাত মাঠে কাজ করছেন। প্রচার, ভোট গণনার প্রস্তুতি, হ্যান্ডবিল, সমাবেশ—সব জায়গায় ধানের শীষের টিম দৃশ্যমান। জেলা বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা রিপন তালুকদার বলেন—চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুর আগে আমাদের নেতার হাতে ধানের শীষের আমানত দিয়ে গেছেন। এই আমানত রক্ষায় মিলনের বিজয় নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত।”
তাদের দাবি—গ্রাম–গঞ্জে বিএনপির সমর্থন সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর এখন আরও শক্তিশালী। নবীনদের সামনে চ্যালেঞ্জ সংগঠন ও গ্রহণযোগ্যতা অন্যদিকে নবীন প্রার্থীদের সামনে বড় সমস্যা হলো—সংগঠন ও গ্রহণযোগ্যতার স্বল্পতা। তরুণ ভোটাররা পরিবর্তন চাইলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে সংগঠনের শক্তি প্রয়োজন, যা তাদের মধ্যে এখনো তৈরি হয়নি।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে,যে প্রার্থী শুধু তরুণ স্লোগান নয়, সংগঠন ধরে রেখে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে মানুষ আনতে পারবেন—জয় সেদিকেই যাবে। এই বাস্তবতার আলোকে, নবীন প্রার্থীদের ঢেউ থাকলেও তা এখনো স্থায়ী শক্তিতে রূপ না নেওয়ায় নির্বাচনী মাঠে প্রবীণ মিলনই তুলনামূলক এগিয়ে।
অভিজ্ঞতা বনাম পরিবর্তন—বড় পরীক্ষার সামনে সুনামগঞ্জ–৫ আসনের এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি দুই রাজনীতির দর্শনেরও লড়াই প্রবীণের অভিজ্ঞতা, সংগঠন, নেতৃত্বের স্থিতি নবীনদের পরিবর্তনের আহ্বান, নতুন মুখের আকর্ষণ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের এই বিশাল আসনে শেষ হাসি কার মুখে ফুটবে—প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা মিলনের, নাকি নবীনদের স্বপ্ন বাস্তবতা ছুঁতে পারবে—তা জানাবে নির্বাচন–পরবর্তী ফলাফল। স্থানীয়রা বলছেন—এই আসনে ভোট সবসময়ই আবেগ নয়, হিসাব–নিকাশে হয়। যে প্রার্থী সংগঠন, প্রভাব ও সম্পর্ক ধরে রাখতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।” সবমিলিয়ে বলা যায়, সুনামগঞ্জ–৫ আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াই হলেও মূল আলোচনায় একজনই—প্রবীণ ও পরিচিত নেতৃত্ব কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, লড়াই ততই তীব্র হচ্ছে।
Leave a Reply