ছাতকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের আর্তনাদ
প্রভাবশালীদের হুমকি–হয়রানিতে নিরাপত্তাহীন দিনযাপন
স্বাধীনতার সুফল কোথায়—জানতে চায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা
ছাতক প্রতিনিধি:
দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন বাজি রাখা পরিবারগুলো আজও নিরাপদ নয়—এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে সুনামগঞ্জের ছাতকে। উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ছনবাড়ী এলাকার ধনীটিলা গ্রামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের বাড়ি-ঘর দখলের অপচেষ্টা, হুমকি, ভয়ভীতি ও দীর্ঘমেয়াদি হয়রানির মাধ্যমে দিনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলেছেন।
হয়রানির শিকার পরিবারটির দাবি, একদিকে গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তিয়াজ আলী, অন্যদিকে ইলিয়াছ আলী নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলেমিশে নানা কৌশলে তাদের বসতভিটা দখলের চাপ সৃষ্টি করছেন। বারবার হুমকি দিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলছেন নারী-শিশু পর্যন্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিবারটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ছাতক থানা, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
ভূমিহীন হিসেবে সরকারি বন্দোবস্ত—এরপর শুরু দখলের হুমকি পরিবারটির কর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আঞ্জব আলী। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও দেশ স্বাধীন করার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তিনি ভূমিহীন পরিবার হিসেবে সরকারি তফসিলভুক্ত একটি জমিতে বসবাসের অনুমতি পান।
পরিবারের সদস্যরা জানান“জমিটিতে আমরা প্রায় চার দশক ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছি। সরকারি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আবেদনও করা হয়েছে। এখানে রয়েছে আমাদের চারটি বসতঘর, রয়েছে পরিবার-পরিজনের জীবনের স্মৃতি। অথচ এখন আমাদেরই উচ্ছেদের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে প্রভাবশালীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা আঞ্জব আলীর সন্তানদের নির্মিত বসতঘর এবং দীর্ঘদিনের বসবাসের স্পষ্ট প্রমাণ।
পরিবারের অভিযোগ—আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরকারি জমি বিভিন্ন সময়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিক্রি করেছেন, আর এখন সেই একই কায়দায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জমিও দখলের হুমকি দিচ্ছেন।
হুমকির পুরনো ইতিহাস—২০২০ সালেও হয়েছিল হামলা ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। সে সময় থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ কিছুদিন নিরাপত্তা প্রদান করে। এরপর পরিস্থিতি শান্ত থাকে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর গত ছয় মাস ধরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এ দখলচক্র, অভিযোগকারীদের ভাষায়—তারা নানা কৌশলে, কখনো রাতে, কখনো দিনে এসে হুমকি দিচ্ছে। বলছে—জমি আমাদেরই হবে, তোমরা চলে যাও। না হলে পরিণতি খারাপ হবে।”
বীর মুক্তিযোদ্ধার সহধর্মিণীর বেদনাময় বক্তব্য
বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আঞ্জব আলীর সহধর্মিণী ছায়ারুন নেছা বলেন,সরকার আমাদের ভূমিহীন পরিবার হিসেবে সম্মান দিয়ে এই জায়গা দিয়েছে। আমরা ভাতা পাই, স্বীকৃতি পাই—এটাই আমাদের গর্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদেরই গ্রামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তিয়াজ আলী আর ইলিয়াছ আলী মিলে আমাদের ঘরবাড়ি দখলের চেষ্টা করছে। তারা দুই-একটি পরিবারকেও উচ্ছেদ করেছে। এখন আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ, হুমকি, ভয়ভীতি দিয়ে চলেছে। আমরা আতঙ্কে দিন কাটাই। প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তার কণ্ঠে কেবল বেদনা নয়—এক ধরনের আক্ষেপও—স্বাধীনতা পেলাম, কিন্তু নিরাপত্তা পেলাম না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের আর্তনাদ
পরিবারটির পুত্র জহির আলী জানান,আমরা তিন ভাই, দুই বোন—কষ্ট করে উপার্জন করি, সৎভাবে জীবনযাপন করি। বাবার সংগ্রামের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকারি দেওয়া জায়গায় থাকছি। কিন্তু এখন হুমকি-ধামকিতে আমরা শান্তি হারিয়েছি। কখন কারা এসে কোন অপকর্ম করবে—এই ভয় নিয়ে বাঁচছি।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে বিশ্বাস করি—প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দেবে, ন্যায়বিচার দেবে। পাশের এক প্রতিবেশী জানান আমাকেও একইভাবে পায়তারা করে জায়গা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এরা খুব সংগঠিত। কারো কিছু বলার সাহস নেই। আইনগত লড়াই—তবুও থামছে না হুমকি।
জানা যায়, ২০২৫ সালে ভুক্তভোগী জহির আলী সুনামগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত ইন্তিয়াজ আলীসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।কিন্তু মামলা চলমান থাকার পরও প্রভাবশালীরা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের।
জহির আলীর ভাষায়,মামলা আছে, অভিযোগ আছে—তারপরও তারা থেমে নেই। প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে আমাদের হয়রানি করছে। আমরা এখন পুরোপুরি অসহায়। অভিযুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার পাল্টা বক্তব্য।অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিযুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তিয়াজ আলী বলেন,ওরা বারবার মিথ্যা অভিযোগ করে। যে অভিযোগ করেছে সেগুলোর জবাব আমি সব সময়ই দিয়েছি, এখনো দেব। আমি বৃদ্ধ মানুষ, অন্যায় কিছু করতে চাই না। তার কথায় অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করা হলেও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে ভিন্ন কথা—বহু বছর ধরে চলমান বিরোধের কারণে এলাকায় উত্তেজনা থেমে থেমে জ্বলছে।
গ্রামবাসীর শঙ্কা—বাড়ছে অস্থিরতা গ্রামবাসীর অনেকেই চান না নাম প্রকাশ করতে। তাদের ভাষ্যএটি এখন একটি শক্তিশালী দখলচক্রে পরিণত হয়েছে। কে কাকে ভয় দেখায়, কে কার ঘরে যায়—এসব নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর ধীরে ধীরে চাপ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও রয়েছে নীরবতা। কেউ মন্তব্য করতে রাজি নন।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর—মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নিরাপত্তাহীন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের অভিযোগ স্পষ্ট—স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও প্রভাবশালীদের হাতে নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে সেইসব পরিবারকে, যাদের আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। এ যেন এক বেদনার ইতিহাস—যে পরিবার স্বাধীনতার জন্য বাড়ি-ঘর ছেড়েছিল, আজ সেই পরিবারকেই তাদের নিজ ঘর থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখানো হচ্ছে।
প্রশাসনের প্রতি আকুতি—সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
পরিবারটি জানিয়েছে—তারা ইউএনও, থানা প্রশাসনসহ একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। প্রত্যাশা—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত, একটি নিরাপদ ঢাল ও ন্যায়বিচার। তাদের বিশ্বাস
“প্রশাসন একটু কঠোর হলে প্রভাবশালীরা আর মাথা তুলতে পারবে না। ন্যায়বিচার চাই, নিরাপত্তা চাই,এই ঘটনার একটি বড় দিক হলো—একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার বনাম স্থানীয় প্রভাবশালী বলয়ের সংঘাত। যার মধ্যে একজন অভিযুক্তও নিজে বীর মুক্তিযোদ্ধা—যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার কি এই দেশের মাটিতে নিরাপদ নয়? স্বাধীনতার পরও কেন তাদের সংগ্রাম থামে না? ন্যায়বিচার কি তাদের নাগালের বাইরে? মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের আর্তনাদ স্পষ্ট—আমরা আর লড়াই চাই না, কেবল শান্তিতে বাঁচতে চাই।”
Leave a Reply