ছাতকে আ.লীগ নেতার বাড়ি থেকে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার : পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে তোলপাড়
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হলেও, পুলিশি ভূমিকা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক রহস্য ও তীব্র বিতর্ক। যৌথ বাহিনীর অভিযানে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধারের মতো গুরুতর ঘটনার পরও অভিযুক্ত নেতাকে নতুন কোনো অস্ত্র মামলায় আসামি না করে পুরোনো একটি নাশকতার মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে প্রেরণ করায় জনমনে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই ছাতক ও আশপাশের এলাকায় আলোচনার ঝড় বইছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে আসামিকে রক্ষা করা হয়েছে। এমনকি তার রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করারও চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধার
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে সেনাবাহিনীর একটি টহলদল ও ছাতক থানা পুলিশের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয় দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের খুরমা গ্রামে। এসময় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল খালিকের বসতবাড়ির খড়ের ঘর থেকে ১টি দেশীয় রিভলবার, ১টি পাইপগান, ২টি কার্তুজ এবং ৭টি দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের পর ছাতক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১২৩৭, তারিখ-২৬/০৯/২০২৫) করা হয়। কিন্তু এই জিডি করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রক্রিয়া বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
আসামিকে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো
অভিযানের একদিন পর, শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে পুলিশ আব্দুল খালিককে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তাকে অস্ত্র আইনে নতুন মামলা না দিয়ে, পুরোনো একটি নাশকতার মামলায় (মামলা নং-২৮, তারিখ-২২/০৭/২০২৫; বিশেষ ক্ষমতা আইন) সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আদালতে প্রেরণ করা হয়।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের পরও নতুন মামলা না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা হতবাক। তাদের অভিযোগ, এটি আসলে পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল।
আব্দুল খালিক : অতীতের বিতর্কিত চরিত্র
আওয়ামী লীগের ব্যানার ব্যবহার করলেও এলাকায় আব্দুল খালিক দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়রা জানান, ২০০০ সালে ১৬ আগষ্ট সাবেক এমপি মহিবুর রহমান মানিকের সংবর্ধনা সভায় প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই ঘটনায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
এছাড়া, প্রবাসীসহ এলাকার অনেকের জায়গা-জমি দখল, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি, জোরপূর্বক অর্থ আদায়সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে থানা পুলিশের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে আসছেন। নিয়মিত মাসোয়ারা (মাসিক চাঁদা) দিয়ে পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ফলে তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের মামলা হয়নি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অস্ত্র উদ্ধারের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় পুলিশ যদি নতুন মামলা না দিয়ে পুরোনো মামলায় আসামি দেখায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— এমন মন্তব্য করছেন এলাকাবাসী। অনেকেই মনে করছেন, পুলিশের এই ভূমিকা আসামির রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক প্রভাবের কাছে নতজানু হওয়ারই প্রমাণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রেপ্তারকৃত আসামির রাজনৈতিক পরিচয় পুলিশের পক্ষ থেকে গোপন করা হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও পুলিশের তথ্য বিবরণীতে তা উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে অনেকেই বলছেন, বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে।
বিশেষ সুবিধার অভিযোগ
শুধু তাই নয়, আব্দুল খালিককে গ্রেপ্তারের পর জেলহাজতে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে না রেখে শিশু ও মহিলা সেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি তার জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের শামিল। যদিও পুলিশ কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সফিকুল ইসলাম খান অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “যৌথ বাহিনীর অভিযানে আব্দুল খালিকের বাড়ির সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পরে তাকে একটি পুরোনো নাশকতার মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।”
অন্যদিকে, সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক সার্কেল) মো. আব্দুল কাদের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। বিস্তারিত তথ্যের জন্য ওসি ভালো বলতে পারবেন।” তবে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
জনমনে ক্ষোভ
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, একটি বড় ধরনের অভিযান এবং বিপুল অস্ত্র উদ্ধারের মতো ঘটনায় পুলিশের এই ধরনের রহস্যজনক ভূমিকা জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, পুলিশ আসলে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
এলাকার প্রবীণ এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যদি সাধারণ মানুষ হতো, তবে এতক্ষণে তার নামে একাধিক অস্ত্র মামলা হতো। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তাকে পুরোনো মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে। এটা ন্যায়বিচারের প্রতি অবমাননা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ঘটনাটি কেবল একটি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতির আড়ালে লুকানো সন্ত্রাস ও পুলিশের দুর্নীতির বাস্তব চিত্র। একজন ইউনিয়ন পর্যায়ের সাধারণ সম্পাদক কীভাবে বছরের পর বছর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, আর প্রশাসন চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে— সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
উপসংহার
ছাতকে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধারের পরও পুলিশি ভূমিকার কারণে নতুন মামলা না হওয়া পুরো ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি একদিকে প্রশাসনের দুর্বলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবের নগ্ন প্রকাশ।
যদি এমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এখন দেখার বিষয়— এই আলোচিত ঘটনাটির তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, আর সত্যিই কি আইনের চোখে সবাই সমান থাকে, নাকি প্রভাবশালীরা রক্ষা পেতে থাকে।
Leave a Reply