সুনামগঞ্জ–৫ আসন
নির্বাচনের একদিন আগে চরম উত্তেজনা, বিএনপি–জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই!
ষ্টাফরিপোটারঃ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা, ভোটের অঙ্ক কষা, সমর্থকদের মাঠে সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে টানটান পরিস্থিতি। ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, কিন্তু মূল লড়াই বিএনপি–জামায়াতের সুনামগঞ্জ–৫ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী থাকলেও মাঠের বাস্তব রাজনীতিতে প্রাধান্য রয়েছে মূলত দুই দলের—বিএনপি ও জামায়াতের। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক শক্তিতে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ, ঘরে ঘরে প্রচারণা ও নারী–তরুণ ভোটারের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত উল্লেখযোগ্য সাড়া পাচ্ছে।
একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের দাবি—ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির সম্ভাবনা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। পীর ফুলতলী মশলক ও জমিয়তে উলামায়ের প্রভাবশালী অংশও বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির লিফলেট প্রতিটি এলাকায় বিতরণ করছে।
গত সোমবার রাত থেকে ইসলামপুর ইউপির আওয়ামীলীগের দলীয় নেতাকমীরা বিএনপির প্রাথী মিলনের পক্ষে মাঠে প্রচার প্রচারনা,ভোট প্রাথনা করছেন। তারা বিশাল ভোটের ব্যবধানে ইসলামপুর ইউপির প্রতিটি কেন্দ্র জয় লাভ করবেন বলে নিশ্চিত করেন আব্দুল কদ্দুছ।
বিএনপির প্রচারণায় রাতভর ব্যস্ততা গত সোমবার গভীর রাতে ছাতকওদোয়ারাবাজার উপজেলার মোট ১৭০টি কেন্দ্রকে ঘিরে উঠান বৈঠক, পথসভা ও খণ্ড খণ্ড মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ভাষ্যমতে, এই প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে অসাধারণ সাড়া ফেলেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ–৫ আসনের প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন টানা প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন।
দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় মিলনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয় যখন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী মিজানুর রহমান চৌধুরী দলীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে দৃঢ়ভাবে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে দাঁড়ান। ফলে আভ্যন্তরীণ দ্বিধা–দ্বন্দ্ব দূর হয়ে বিএনপি একক অবস্থানে মাঠে নেমেছে।
বিএনপি প্রার্থী মিলনের প্রতিশ্রুতি বিএনপি প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলন নির্বাচিত হলে ছাতককে পৃথক উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, “সুনামগঞ্জ–৫ বিএনপির ঘাঁটি, জনগণ ধানের শীষকে ভালোবেসে আবারও বিপুল ভোটে জয়ী করবে।”
ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সামছুর রহমান সামছু বলেন,
“মিলন মানুষে মানুষে মিলনের প্রতীক। সব শ্রেণি–পেশার মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয়। বিশাল ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষ বিজয়ী হবে—এ ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “যে–কেউ বাধা দিলেও ধানের শীষের বিজয় ঠেকানো যাবে না।”
জামায়াতের তৎপরতা ও শেষ মুহূর্তের উত্থান
অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী, যিনি সিলেট মহানগর জামায়াতের সুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের কাছে শেষ মুহূর্তে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পরিচালক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম তালুকদার বলেন,“দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা, হুমকি, ভয়ভীতি—সত্ত্বেও জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিতে প্রস্তুত। এবার নীরব ভোট বিপ্লব হবে।”
বিএনপি–জামায়াত টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—আওয়ামী লীগের স্থায়ী ভোটব্যাংকের একটি অংশ এবার কোন দিকে ঝুঁকবে? একাধিক নেতা–কর্মী মনে করেন, তাদের ভোট যদি বিএনপির দিকে যায়, তাহলে ধানের শীষের জয়নিশ্চিতভাবে আরও সুসংহত হবে। আবার যদি বিভক্ত হয়, তবে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন,
“ধানের শীষ ছাড়া আমাদের অন্য কোনো অবস্থান নেই। আমাদের সব শক্তি মিলনের পক্ষে।”
তৃতীয় শক্তির প্রার্থীরাও মাঠে আছে
বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে আরও তিনজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন—
মোহাম্মদ আব্দুল কাদির – খেলাফত মজলিস (প্রতীক: দেয়াল ঘড়ি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম – জাতীয় পার্টি (প্রতীক: লাঙ্গল) মো. আজিজুল হক – এনপিপি (প্রতীক: আম) যদিও তাদের প্রচারণাও মাঠে রয়েছে, ভোটের প্রধান সমীকরণে তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন বলে বিশ্লেষকদের বক্তব্য। ভোটার সংখ্যা ও কেন্দ্র বিন্যাস নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সুনামগঞ্জ–৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৮ জন। এর মধ্যে—পুরুষ ভোটার: ২,৭০,৬২০ জন নারী ভোটার: ২,৫৬,৮৩৬ জন
হিজড়া ভোটার: ২ জন ছাতক ও দোয়ারাবাজার—এই দুই উপজেলায় রয়েছে মোট ১৭০টি ভোটকেন্দ্র, যেগুলোকে কেন্দ্র করে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ভোটারদের উচ্চমাত্রার আগ্রহ গ্রামীণ বাজার, ওয়ার্ড পর্যায়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—কে জিতবে সুনামগঞ্জ–৫? একটি বড় অংশের ভোটার এই আসনকে ‘হাই–ভোল্টেজ’ আসন বলে উল্লেখ করছেন।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে,বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী,জামায়াত সামাজিক নেটওয়ার্কে অগ্রগামী,তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে,নারী ভোটারের অংশগ্রহণ এবার বাড়তে পারে।এসব মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে লড়াই আরও জমে উঠেছে।
আর মাত্র একদিন পরই স্পষ্ট হবে—ছাতক–দোয়ারাবাজারবাসী কাদের ওপর ভরসা রাখছেন। ধানের শীষ কি টানা প্রচারণা ও দলীয় শক্তিতে বড় ব্যবধানে জয় পাবে, নাকি দাঁড়িপাল্লার নীরব সাড়া ভোটবিপ্লবে রূপ নেবে—এ নিয়ে পুরো আসনজুড়ে উত্তেজনা চরমে।
Leave a Reply