সাগরে নৌকাডুবিতে ছাতকের মুহিবুরের মৃত্যু
স্বপ্ন ভাসল সাগরে, গৃহে শোকের মাতম
ছাতক সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
ভূমধ্যসাগরের নীলজল এবার কেড়ে নিল সুনামগঞ্জের ছাতকের আরেক তরতাজা যুবকের প্রাণ। উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে লিবিয়া হয়ে গ্রিসের পথে যাত্রা করা মুহিবুর রহমানের মৃত্যুতে গাগলাজুর গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে নিঃশব্দ কান্না, চারদিকে অস্থির শোকের মাতম।
নিহত মুহিবুর রহমান উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের নুরুল আমিনের ছেলে। দালালচক্রের ঝকঝকে আশ্বাসে মোহাবিষ্ট হয়ে তিনি পা বাড়িয়েছিলেন ভাগ্য বদলের পথে। কিন্তু ফেরার পথ আর খুলে দেয়নি নির্মম সাগর।
সাম্প্রতিক ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডিতে যেসবতরুণের জীবন থেমে গেছে, তাদের তালিকায় উঠে এসেছে মুহিবুরের নামও।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা গ্রামের দালাল নবীর হোসেনের সঙ্গে প্রায় ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে মুহিবুরসহ আরও কয়েকজন যুবক গ্রিসমুখী বিপদসঙ্কুল এই যাত্রায় বের হন। উত্তাল সাগরে নৌকা উল্টে মৃত্যু হয় অন্তত ২২ অভিবাসীর; যাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশের তরুণ স্বপ্নসন্ধানী।
এ ঘটনার কয়েকদিন পর গ্রিসে পৌঁছানো জগন্নাথপুরের সাদিপুর গ্রামের যুবক মারুফ মোবাইল ফোনে নিশ্চিত করেন—মুহিবুর আর জীবিত নেই। তিনি ভাসমান লাশ দেখেছেন, দেখেছেন বাঁচার জন্য আর্তচিৎকার। তবে মুহিবুরের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, সাগরে ভাসতে ভাসতে বহু মরদেহ পচে গন্ধ ছড়াতে শুরু করায় সেগুলো মাঝ সাগরেই ফেলে দিতে বাধ্য হয় উদ্ধারকারী নৌকা। ধারণা করা হচ্ছে, একই পরিণতি হয়েছে মুহিবুরেরও—অন্ধকার গভীর সাগরে চিরতরে ডুবে গেছে তার দেহ, তার স্বপ্ন।
গত ১ এপ্রিল বুধবার সরেজমিনে গাগলাজুর গ্রামে গেলে দেখা যায়, গৃহে চলছে মৃত্যুপুরীর নীরবতা। শোকে স্তব্ধ পরিবার। ছোট ভাই হাফিজুর রহমান অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। মা মহিমা বেগম শয্যাশায়ী, অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন বারবার। চোখের জল থামাতে পারছেন না তার পিতা নুরুল আমিন; বাকরুদ্ধ, পথহারা মানুষের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু প্রশ্ন—“এভাবে কি ছেলেকে ফিরে পেতে হয়!”
স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে গ্রামের বাতাস। কেউ সান্ত্বনা দিতে গেলে কান্নায় থরথর হয়ে ওঠে বাড়ির দেয়ালও।
তাদের একটাই দাবি—দালালচক্রকে আইনের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কারণ এসব দালালের প্রতারণা ও লোভের জালে পড়ে প্রতিদিনই গ্রাম থেকে উধাও হচ্ছে তরুণেরা, সাগরে দাফন হচ্ছে তাদের স্বপ্ন।
শোকের সেই মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন গ্রামের মুরুব্বি সায়াদ মিয়া, আনচার মিয়া, আমির আলী, সমছু মিয়া, তখলুছ মিয়া, সানুর আহমদ, নুরুজ্জামান, গণি মিয়া, আসাদ আহমদ, ছাব্বির আহমদ, আখলু মিয়া, আব্দুল গফফার, বুলবল আহমদ, নানু মিয়া, মনসুর আহমদ, সারওয়ার আহমদ, মাসুদ আহমদ, জাকারিয়া, এমরান, সাইফুল, ইকবাল হোসেন, সাইফ আহমদ, সাজু মিয়াসহ গ্রামের শত শত মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি—“একটি মুহিবুরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, পুরো সমাজের চেতনাকে নাড়া দেয়। দালালদের দৌরাত্ম্য থামাতে না পারলে আরও কত ঘরে শোকের কালো নিশান উড়বে—তা কেউ জানে না। উল্লেখ্য, একই ঘটনায় সুনামগঞ্জের আরও কয়েকজন যুবক নিহত হয়েছেন; এক যুবকের কোনো হদিস এখনো মেলেনি।####
Leave a Reply