শশুড়বাড়ির সাথে অবিচার:
সিলেটের প্রাপ্য মন্ত্রিত্ব কোথায়?
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ !
ষ্টাফরিপোটারঃ
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসার এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেশের মানুষের মাঝে নতুন প্রত্যাশা জাগালেও, সরকার ঘোষিত মন্ত্রিসভা নিয়ে সিলেট বিভাগের রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা।
কারণ—সিলেট বিভাগের অভূতপূর্ব নির্বাচনী সাফল্যের বিপরীতে তাদের মন্ত্রিসভার প্রতিনিধিত্ব প্রায় নগণ্য। সিলেট বিভাগে মোট ১৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ১৮টি, যা এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বিজয়। কিন্তু সেই সাফল্যের প্রতিফলন মন্ত্রিসভায় মাত্র দুইজন সদস্য! প্রশ্ন উঠছে—এটা কি রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতা রক্ষা, নাকি সরাসরি সিলেটের প্রতি বৈষম্য?
সিলেটের বিজয়—জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিধসের মতো।
সিলেট বিভাগে এমন বিজয় আগে খুব কমই দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের ক্ষমতার পর বিএনপির পক্ষে এমন গণজোয়ার ছিল অনেকটা অবাক করার মতো।
সিলেটবাসী তাদের ভোট দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—তারা পরিবর্তন চায়, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের শক্ত ভূমিকা দেখতে চায়। এ অঞ্চলের ভোট রাজনৈতিকভাবে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতেও বিভিন্ন সরকার সিলেটকে ‘কিংমেকার অঞ্চল’ বলে মনে করেছে।
কিন্তু এবার সেই অবদান ক্ষমতা বণ্টনের সময় যেন বিলীন হয়ে গেল। ভোট নেওয়ার সময় সিলেটের কদর থাকলেও—ক্ষমতা ভাগাভাগিতে যেন উপেক্ষা!
চট্টগ্রাম বিভাগ পেল ১২ জন—তুলনায় সিলেট প্রায় শূন্য ঘোষিত মন্ত্রিসভার তালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী স্থান পেয়েছেন। ঢাকা ও খুলনা থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। এমনকি কয়েকটি বিভাগে মাত্র ৪–৬ আসন জিতেও ৩–৪ জন প্রতিনিধি জায়গা পেয়েছেন।
এদিকে সিলেট বিভাগ ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেও মাত্র দুই আসনের প্রতিনিধিত্ব! রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এটি কেবল অসম প্রতিনিধিত্বই নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মেসেজ—যা সিলেটবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সিলেটের রাজনীতিতে প্রশ্ন: ‘আমরা কি শুধুই ভোট দেওয়ার যন্ত্র? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক–টুইটারে সিলেটের তরুণদের ক্ষোভ এখন ট্রেন্ডের মতো। অনেকে লিখছেন—“যখন ভোট দরকার তখন সিলেট দরকার, মন্ত্রী বানাতে গেলে সিলেট অদৃশ্য হয়ে যায়। “সিলেটকে শশুড়বাড়ির মতো মনে করা হয়—ভোটে বড় দায়িত্ব, কিন্তু ক্ষমতায় গুরুত্ব নেই।”
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরাও বলছেন, এমন আচরণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। কারণ সিলেট শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে সিলেট অঞ্চল থেকে। সেই সিলেটকে সরকারে অবমূল্যায়ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একজন সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতামত একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন—“মন্ত্রিসভায় সিলেটের প্রতিনিধিত্ব যদি এভাবে কম থাকে, তাহলে এটি বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ সিলেট এমন একটি এলাকা যেখানে প্রতিটি দল ক্ষমতায় গিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বাধ্য।
বিএনপিরও তার ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়।”ধারণা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব বিএনপি নির্বাচনকালে ঘোষণা করেছিল—তারা একটি ‘সমতাভিত্তিক সরকার’ গঠন করবে। আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এ লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি। মন্ত্রিসভার প্রথম ধাপে সিলেট উপেক্ষিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—এটা কি ইচ্ছে করেই করা হয়েছে?
নাকি রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরের জটিল সমীকরণ? বহু পর্যবেক্ষকের মতে, সিলেটের প্রতি অবহেলা বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ সিলেট প্রবাসী কেন্দ্রিক রাজনীতিরও অন্যতম কেন্দ্র। দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সিলেটি জনগোষ্ঠী বিএনপির বড় সমর্থকঘর।
জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান জরুরি গণতন্ত্রে জনগণের রায়ই সর্বোচ্চ। সিলেটের মানুষ তাদের ভোটের মাধ্যমে যে বার্তা দিয়েছে, তা অবহেলা করলে রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সিলেট বিভাগকে অবজ্ঞা করলে দেশের আঞ্চলিক ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাধারণ মানুষের মতে—সিলেট শুধু ভোট দেয় না, দেশ গঠনে ভূমিকা রাখে। সিলেটের সম্মান না দিলে কোনো সরকারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।”সিলেটের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।সিলেটের মানুষের এখন একটাই দাবি—
ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব। সমান গুরুত্ব।রাজনৈতিক মর্যাদা। এটা শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি ন্যায়বিচারের দাবি। একটি সমতাভিত্তিক, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সিলেটকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করতে হবে—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
বিএনপি সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তন, ন্যায়বিচার এবং সমতার কথা বলে থাকে, তবে সিলেট বিভাগকে গুরুত্ব দিতে হবে। সিলেটের মতো অবদানশালী অঞ্চলের অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য আসবে না। নির্বাচন হয়েছে, সরকারও গঠন হয়েছে—এখন সময় আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার। সিলেটের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো শুধু রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতা নয়, এটি জাতীয় স্বার্থেও প্রয়োজন।কারণ—যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তারই প্রাপ্য সম্মানও সবচেয়ে বড়।
Leave a Reply